সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বশীর ও সিতি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে তাঁদের কথিত ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ড’ নিয়ে কৌতূহল প্রবল। কিন্তু তাঁরা ঠিক কী করেছিলেন, কী প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না—এসব প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে আড়ালে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে ঘিরে যৌনতার খবর দ্রুত ছড়ায়। সেই কৌতূহল কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নকেও চাপা দেয়। এই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় আরেকটি বিষয় সামনে আনা জরুরি: বাংলাদেশের দুর্বল কূটনীতি।
প্রশ্নটি শুধু সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা নিয়ে নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিয়েও। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের অবহিত করা হয়নি। তাহলে এই দুই নাগরিক গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তাঁদের বিচার ও আপিলের পর্যায় পর্যন্ত বাংলাদেশ মিশন কী ভূমিকা পালন করেছে? তাঁদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন কি না, অভিযোগ ও প্রমাণ বুঝতে প্রয়োজনীয় ভাষাগত সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি না—এসব তথ্য কি বাংলাদেশ সরকার নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করেছে? মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছে। কিন্তু নাগরিকের জীবন চলে যাওয়ার পর প্রতিবাদ জানানো আর জীবন রক্ষার জন্য আগেভাগে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশের দুর্বলতার জায়গাটি এখানেই। বিদেশে নাগরিকের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের কূটনীতি অনেক সময় ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে কনস্যুলার নজরদারি, আইনি সহায়তা, নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ এবং উচ্চপর্যায়ে আগাম হস্তক্ষেপ অপরিহার্য। কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তাঁকে ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালিত হয়েছে কি না, তার জবাবদিহি বাংলাদেশ সরকারের কাছেও চাইতে হবে।
১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ বিদেশে আটক নাগরিকের কনস্যুলার অধিকার স্বীকার করে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দূতাবাসকে না জানানোর তথ্য একাই এই অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আটক ব্যক্তিদের তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না, তাঁরা কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন কি না এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব তথ্য যাচাই করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রেপ্তারের নথি, অভিযোগপত্র, পূর্ণাঙ্গ রায়, আপিলের বিবরণ, আইনজীবীর তথ্য এবং কনস্যুলার যোগাযোগের রেকর্ড চাইতে হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও উপযুক্ত আইনি প্রতিকারের উদ্যোগ নিতে হবে।
এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আন্তর্জাতিক নজির রয়েছে। ২০০১ সালের LaGrand মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জার্মান নাগরিকদের কনস্যুলার অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনা করে। ২০১৯ সালের Jadhav মামলায় ভারত-পাকিস্তান বিরোধেও আদালত কনস্যুলার অধিকারসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের সিদ্ধান্ত দেয়। অর্থাৎ বিদেশে আটক নাগরিকের অধিকার রক্ষা শুধু দ্বিপক্ষীয় সৌজন্যের বিষয় নয়; এর আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তিও রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার সুযোগ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর এখতিয়ারসংক্রান্ত সম্মতির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের কূটনীতির দুর্বলতা বুঝতে সৌদি আরবের সঙ্গে শ্রমসম্পর্কের অসমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। সৌদি অর্থনীতি শ্রমিক গ্রহণ করে, বাংলাদেশ শ্রমশক্তি সরবরাহ করে। এই সম্পর্ক থেকে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা পায়, বহু পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। ফলে শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক নির্ভরতা যদি নাগরিকের অধিকার নিয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে কূটনীতির অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। শ্রমবাজার রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; কিন্তু সেই বাজার সচল রাখতে গিয়ে শ্রমিকের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নকে গৌণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের বিকল্প হতে পারে না।
এখানেই ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তুলনার সুযোগ তৈরি করে। এই দেশগুলোর নাগরিকেরাও বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের সরকার বিভিন্ন ঘটনায় কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ, আইনি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক প্রচারের পথ নিয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে দণ্ড স্থগিত বা পরিবর্তনের প্রচেষ্টাও চালিয়েছে। প্রতিটি মামলার পরিস্থিতি আলাদা, তাই সাফল্যের দাবি নির্দিষ্ট ঘটনা যাচাই করে করতে হবে। কিন্তু নীতিগত পার্থক্যটি স্পষ্ট: নাগরিকের জীবন ঝুঁকিতে পড়লে রাষ্ট্রের কাজ শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা নয়, নাগরিকের পক্ষে সেই সম্পর্কের ভেতরেই কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা।
শক্ত পররাষ্ট্রনীতি মানে বড় রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ বাধানো নয়। এর অর্থ হলো, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেও নাগরিকের অধিকার নিয়ে আপস না করা। কূটনৈতিক প্রতিবাদ, উচ্চপর্যায়ের আলোচনা, আইনি সহায়তা, আন্তর্জাতিক জনমত এবং প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয়—এসবই পররাষ্ট্রনীতির স্বীকৃত উপকরণ। কিন্তু এসব উপকরণ ব্যবহার করার মতো প্রস্তুতি, তথ্যব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে কূটনীতি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতেই আটকে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, আমাদের দূতাবাসগুলো কি বিদেশে আটক নাগরিকদের মামলার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে? মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলে কি ঢাকায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে? নাকি পরিবার ও সংবাদমাধ্যমের চাপ তৈরি হওয়ার পরই সরকার সক্রিয় হয়?
নারী অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতার মূল্য আরও বেশি হতে পারে। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, আর্থিক নির্ভরতা এবং সামাজিক কলঙ্ক তাঁদের আইনি সহায়তা পাওয়ার পথ কঠিন করে তোলে। সিতি আক্তারের মামলায় স্বাধীন আইনি সহায়তা ও কার্যকর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল কি না, তা জানার দাবি তাই বিশেষভাবে জরুরি। তাঁর কথিত আচরণ নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি করা সহজ; কিন্তু তাঁর অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র কী করেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সরকারের সামনে এখন দুটি দায়িত্ব। প্রথমত, এই দুই নাগরিকের মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করে বিচারপ্রক্রিয়া ও কনস্যুলার সহায়তার যথার্থতা যাচাই করা। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য বাধ্যতামূলক কনস্যুলার পর্যবেক্ষণ, দ্রুত আইনি সহায়তা, পরিবারকে তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের সুস্পষ্ট নীতি গড়ে তোলা। এই ব্যবস্থা শুধু সৌদি আরব নয়, সব দেশের ক্ষেত্রেই কার্যকর হতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শ্রমবাজারের হিসাব দিয়ে নাগরিকের অধিকারকে মাপতে পারে না। সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সম্পর্কের গুরুত্ব বাংলাদেশের নাগরিকের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। বিদেশে একজন সাধারণ শ্রমিকের পাশে দাঁড়াতে রাষ্ট্র যদি যথাসময়ে সক্রিয় না হয়, তাহলে তার কূটনৈতিক সক্ষমতা ও নাগরিকের প্রতি দায়বদ্ধতা—দুটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। যৌন কৌতূহল ও ধর্মীয় বিতর্কের আড়ালে এই মৌলিক প্রশ্নটি হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না: বাংলাদেশ কি শুধু শ্রমিক রপ্তানি করবে, নাকি বিদেশে সেই শ্রমিকের জীবন, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার দায়িত্বও নেবে?